বিয়ের আগেই হোক থ্যালাসিমিয়া পরীক্ষা!  Banner Photo

Ω author: Sadia Tasmia

 864  1  0

থ্যালাসেমিয়া একটি জেনেটিকাল রক্তের ব্যাধি যা শরীরটি হিমোগ্লোবিনের অস্বাভাবিকতা তৈরি করে। হিমোগ্লোবিন হল লাল রক্ত কণিকার প্রোটিন অণু যা অক্সিজেন বহন করে। এই রোগের ফলে রক্তকণিকা অতিরিক্ত ধ্বংস হয়, যা থেকে অ্যানিমিয়া হয়। অ্যানিমিয়া এমন একটি অসুখ যার ফলে আপনার শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে স্বাভাবিক এবং সুস্থ লাল রক্ত কণিকা থাকে না। থ্যালাসেমিয়া উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, যার অর্থ আপনার বাবা-মায়ের মাঝে অন্ততপক্ষে একজন এই রোগের বাহক হতে হবে। এটি একটি জেনেটিক মিউটেশন বা নির্দিষ্ট কোনো জিন লোপ পাওয়ার দ্বারা সৃষ্ট হয়।

থ্যালাসেমিয়া মাইনর এই রোগের একটি কম গুরুতর ধরন। থ্যালাসেমিয়া দুটি প্রধান ধরন রয়েছে যা আরও গুরুতর। আলফা থ্যালাসেমিয়াতে, আলফা গ্লবিন জিনগুলির মধ্যে পরিবর্তন বা অস্বাভাবিকতা আসে। বিটা থ্যালাসেমিয়াতে, বিটা গ্লবিন জিনগুলি প্রভাবিত হয়। থ্যালাসেমিয়া প্রতিটি ধরনের আবার সাব-টাইপ আছে। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের থ্যালাসেমিয়া বিভিন্নভাবে উপসর্গর তীব্রতাকে প্রভাবিত করবে।

থ্যালাসেমিয়া লক্ষণ পরিবর্তিত হয়ে থাকেসর্বাধিক সাধারণত যে লক্ষণ দেখা যায়ঃ


  • হাড় বিকৃতি, বিশেষ করে মুখের।

  •  ঘন প্রস্রাব

  •  বিলম্বিত বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন

  • অত্যধিক ক্লান্তি এবং ক্লান্তি

  • হলুদ বা ফ্যাকাশে ত্বক


যে কারণে থ্যলাসেমিয়া হয়ে থাকেঃ


হেমোগ্লোবিন উৎপাদনে জড়িত থাকা জিনগুলির মধ্যে অস্বাভাবিকতা বা মিউটেশন থাকলে থ্যালাসেমিয়া হয়। পিতামাতার থেকে জেনেটিকভাবে এই অস্বাভাবিকতা আসে।

কেবলমাত্র আপনার বাবা-মার মাঝে যদি একজন বাহক হন তবে আপনি থ্যালাসেমিয়া মাইনর নামে পরিচিত রোগটির একটি শিকার হতে পারেন। যদি তা হয় তবে খুব সম্ভবত আপনার শরীরে কোনো উপসর্গ থাকবে না, তবে আপনি এই রোগের বাহক হবেন। খুব কম লোকের শরীরেই থ্যালাসেমিয়া মাইনরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপসর্গ দেখা যায়।


যদি আপনার পিতামাতা উভয়ই থ্যালাসেমিয়া বাহক হয়, তবে আপনি গুরুতর ভাবে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।


সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন ট্রাস্টেড সোর্স (সিডিসি) অনুসারে, থ্যালাসেমিয়া এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং গ্রীস ও তুরস্কের মতো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী হয়।



যে কারণে বিয়ের আগেই থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করা উচিৎঃ


যখন দুজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক বিয়ে করে এবং সন্তান হওয়া নেয়, তখন ২৫% সম্ভাবনা থাকে যে সন্তানও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবে। থ্যালাসিমিয়াতে আক্রান্ত বাচ্চাকে বলা হয়ে থাকে “থ্যালাসিমিয়া মেজর” এবং এই ধরণের বাচ্চাদের নির্দিষ্ট সময় পর পর ব্লাড ট্রান্সফিউশানের দরকার পড়ে। তাই বাবা-মা উভয়ই যদি থ্যালাসিমিয়াতে আক্রান্ত হয়, তবে তা বাচ্চার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়, কেননা থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত একটি বাচ্চার সুস্থ্য হবার একমাত্র উপায় হলো বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করা, যা অনেকেরই করানোর সাধ্য হয়ে ওঠেনা। 

তাই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়ার জন্য একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা দম্পতিদের জানতে সাহায্য করে যে তারা এর বাহক কিনা। উভয় যদি বাহক না হয়, তাহলে আর চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু যদি উভয় বাহক থাকে, তাহলে তারা সন্তানের উপর এর প্রভাব পড়েছে কিনা তা সনাক্ত করার জন্য গর্ভধারণের প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যে অ্যামনিসোসেসিস নামক একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারে।


যে যে ধরনের থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকেঃ


তিন ধরনের থ্যালাসেমিয়া রয়েছেঃ


  • বিটা

  • আলফা

  • মাইনর


থ্যালাসেমিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিগুলো কী কীঃ


আপনার থ্যালাসেমিয়া থাকলে আপনার ভবিষ্যতে কি ক্ষতি হবে তা রোগের ধরনের উপর নির্ভর করে। থ্যালাসেমিয়া মাইনর হলে রোগী সাধারণত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। গুরুতর হলে তা থেকে হৃদরোগ হতে পারে।


থ্যালাসেমিয়ার কারণে গর্ভাবস্থায় যে সকল সমস্যা হতে পারেঃ


থ্যালাসেমিয়া গর্ভাবস্থার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন অসুখের সূত্রপাত ঘটায়। এই ব্যাধি প্রজনন অঙ্গের উন্নয়নকে প্রভাবিত করে যে কারণে, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মহিলারা প্রজনন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।

আপনার এবং আপনার শিশুর উভয়ের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে, যতটা সম্ভব আগেই সব কিছু পরিকল্পনা করে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি সন্তান নিতে উৎসুক হন তবে, আপনার ডাক্তারের সাথে এই বিষয়ে আগেই আলোচনা করুন। এক্ষেত্রে আপনার শরীরের লৌহমাত্রাকে সবসময় নিরীক্ষনের উপর রাখতে হবে। এছাড়াও আপনার পূর্ব থেকেই থাকা সমস্যাগুলো এক্ষেত্রে বিবেচনায় আনতে হবে।

গর্ভধারণকালে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মহিলারা নিম্নোক্ত ঝুঁকিগুলি বহন করে:


  • ইনফেকশনের উচ্চ ঝুঁকি।

  • গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস।

  • হৃদপিণ্ডজনিত সমস্যা।

  •  হাইপোথাইরয়েডিজম, বা কম থাইরয়েড।

  • রক্ত ট্রান্সফিউশন বৃদ্ধি।

  • লো বোন ডেনসিটি।


থ্যালাসেমিয়া প্রতিকারে যে যে চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তমানঃ


থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসা রোগের ধরন এবং তীব্রতার উপর নির্ভর করে। আপনার ডাক্তার আপনাকে চিকিৎসার একটি কোর্স দেবে যা আপনার জন্য সর্বোত্তম কাজ করবে।


  •  কোর্সের মাঝে যে সকল চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেঃ

  •  রক্ত ট্রান্সফিউশন।

  • অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন।

  •  ওষুধ ও সম্পূরক।

  • সার্জারির দ্বারা স্প্লেন বা গলব্লাডার অপসারণ।


আপনার ডাক্তার আপনাকে লৌহ ধারণকারী ভিটামিন বা সম্পূরক গ্রহন না করার নির্দেশ দিতে পারে। রক্ত ট্রান্সফিউশনের প্রয়োজন হলে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। যারা রক্ত ট্রান্সফিউশন করেন তারা শরীরে অতিরিক্ত লৌহা পান যা সহজে পরিত্রাণযোগ্য না। অতিরিক্ত লৌহ অতিরিক্ত টিস্যু তৈরি করতে পারে, যা মারাত্মক হতে পারে।

আপনি যদি রক্ত ট্রান্সফিউশন গ্রহণ করেন তবে আপনার চিলেশন থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে যা আপনার শরীর থেকে অতিরিক্ত লোহা অপসারণ করতে সাহায্য করে।


কী করে থ্যালাসেমিয়া আয়ত্বে আনবেনঃ


যেহেতু থ্যালাসেমিয়া একটি জেনেটিক ব্যাধি, এটি প্রতিরোধ করার কোন উপায় নেই তবে এর জটিলতাগুলি প্রতিরোধে আপনি এই কিছু উপায় অনুসরণ করতে পারেন। হেপাটাইটিস ভ্যাকসিন এবং চলমান চিকিৎসা সেবা ছাড়াও, খাদ্য এবং ব্যায়াম এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া সহ বেশিরভাগ মানুষের জন্য কম চর্বিযুক্ত, উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্য সর্বোত্তম তবে, আপনার রক্তে উচ্চ লৌহর মাত্রা থাকলে লৌহ সমৃদ্ধ খাবারগুলি কম খেতে হবে। মাছ এবং মাংস লৌহ সমৃদ্ধ, তাই আপনি আপনার খাদ্যতালিকায় এসব কম রাখতে হবে। প্রিজার্ভড সিরিয়াল, রুটি, এবং ফলের রস এড়ানো উত্তম কারণ তাতে খুব উচ্চ পরিমাণে লৌহ রয়েছে। তবে খাদ্যতালিকা পরিবর্তনের আগে আপনার ডাক্তারের সাথে তা নিয়ে আলোচনা করতে ভুলবেন না।

আপনি যদি বর্তমানে শারীরিকভাবে সক্রিয় না হন তবে কোন ধরনের ব্যায়াম ভাল হবে তা আপনি আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। অতিরিক্ত ব্যায়াম আপনার শরীর অনেক সময় আরও খারাপ করতে পারে যে কারণে মাঝারি ধরনের ওয়ার্কয়াউট যেমন, হাঁটা এবং সাইকেল চালনা করাই উত্তম। সাঁতার ও যোগ ব্যায়াম জয়েন্টের জন্য ভাল।


Share On Facebook

please login to review this blog and to leave a comment.


More From PlexusD

এবারের ডেঙ্গু কেনো অন্যবারের চেয়ে আলাদা?

published on: 22 Jul, 2019

এবারের ডেঙ্গু কেনো আলাদা?: এবারের ডেঙ্গু জ্বরের সাথে আগের মিল নেই। নতুন কোন শক্তিশালী ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে ছড়ানো এই অসুখ এবার ঢাকায় রীতিমতো মহামারি ...

 6336    1    0 
ডেঙ্গুঃ কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার এবং প্রতিরোধ!

published on: 21 Jul, 2019

এই বর্ষায় বৃষ্টির সাথেখিচুড়ি তাে উপভােগ করবেনই, তবে আপনারা যাতে সুস্থতার সাথেতা করতে পারেন তাইগুরুত্বপূর্ণ এক...

 1713    1    0 
ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষের যত ভুল ধারণা!

published on: 10 Jul, 2019

বাংলাদেশে ২০৩৫ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৩ মিলিয়নে! নগরায়ন ও শ...

 1686    4    1 

More From Happy Life

কোন সমস্যায় কোন ডাক্তার দেখাবেন || পর্ব ০১ ||

author: Sadia Tasmia

প্রথমবারের মত কোনো রোগের উপসর্গ দেখা গেলে সবার প্রথমেই আমরা যেই ব্যাপারটা নিয়ে সবচেয়ে বেশী চিন্তায় পড়ি তা হচ্ছে, কোন ডাক্তারের কাছে যাব! পেটে ব্যথা হচ...

 364    0    0 
ডিপ্রেশনঃ সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য একমাত্র মানসিক রোগ

author: Sadia Tasmia

বর্তমানে মানুষের মাঝে বহুল প্রচলিত একটি শব্দ হচ্ছে, ডিপ্রেশন (

 152    0    0 
কোন সমস্যায় কোন ডাক্তারের কাছে যাবেন || পর্ব ০২ ||

author: Sadia Tasmia

প্রথমবারের মত কোনো রোগের উপসর্গ দেখা গেলে সবার প্রথমেই আমরা যেই ব্যাপারটা নিয়ে সবচেয়ে বেশী চিন্তায় পড়ি তা হচ্ছে, কোন ডাক্তারের কাছে যাব! পেটে ব্যথা হচ্ছে

 146    0    0