টাইপ: ২ ডায়াবেটিসের আদ্যোপান্ত  Banner Photo

Ω author: Shakhawat Hossain Akash

 8  0  0

ডায়াবেটিস আমাদের অতি পরিচিত একটি রোগ এবং আমরা কমবেশি সকলেই জানি এই রোগ আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকিস্বরূপ। ডায়াবেটিস মূলত রক্তের অনিয়ন্ত্রিত সুগার লেভেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। বিশ্বে প্রতি ১১ জনের একজনের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ডায়াবেটিস হওয়ার মাত্রা কত বেশি। মোটাদাগে ডায়াবেটিস দুই ধরণের হয়ে থাকে এগুলো হলো টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিস। কিন্তু সম্প্রতি সুইডেনে লান্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফিনল্যান্ডের ইন্সটিটিউট ফর মলিক্যুলার মেডিসিন গবেষণা করে দেখেছে এই দুই টাইপের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে এবং তারা পাঁচ ধরণের ডায়াবেটিস চিহ্নিত করেছে। তবে আজকে আমরা জানবো টাইপ২ ডায়াবেটিস সম্পর্কে। 

টাইপ২ ডায়াবেটিস কী? 

টাইপ২ ডায়াবেটিস কে মনে করা হয় অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারার জন্য অর্থাৎ স্থুলতার জন্য শরীরের চর্বির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারনে ইনসুলিন হরমোনের কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্থ হলে এই ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এর ফলে শরীরের গ্লুকোজ এনার্জিতে রুপান্তরিত হতে পারে না। এরপর শরীরের গ্লুকোজের পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকে। একে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। টাইপ২ ডায়াবেটিসের কারনে একজন মানুষের আয়ুষ্কাল ১০ বছর কমে যেতে পারে। সাধারণত ৯০% মানুষের এই টাইপ২ ডায়াবেটিস হয়ে থাকে এবং পূর্ণ বয়স্ক মানুষের মাঝেই হয়ে থাকে এই ডায়াবেটিস। তাই এর আরেক নাম- এডাল্ট অনসেট ডায়াবেটিস। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা ভালো টাইপ১ হলো একদম শৈশবকাল থেকে যে ডায়াবেটিস দেখা যায়। টাইপ১ বেশি ভয়াবহ এবং এদের শরীরে ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে হয়। 

টাইপ২ ডায়াবেটিস হওয়ার কারণগুলোঃ 

  • •জীবনধারনের রীতিঃ মানুষের খাদ্যাভাস ও জীবন ধারনের রীতির জন্য এই রোগ দায়ী। অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাওয়া, স্থুলতা হওয়া, পর্যাপ্ত শারীরিক কর্ম না করার কারনে এই রোগ হয়ে থাকে। চীন ও জাপানীদের মধ্যে ৩০% এবং ইউরোপীয় ও আফ্রিকানদের মধ্যে ৬০-৮০% মানুষের টাইপ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জীবনধারনের রীতি অনেক উল্লেখযোগ্য একটি কারণ। 
  • •জীনগত কারনঃ অসংখ্য জীন টাইপ২ ডায়াবেটিস হওয়ার জন্যে দায়ী। ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৬টির মতো জীন আবিষ্কার হয়েছে যা এই রোগ হওয়ার জন্যে দায়ী। অভিন্ন যমজের মধ্যে একজনের টাইপ২ ডায়াবেটিস থাকলে অপরজনের হওয়ার সম্ভাবনা ৯০% থাকে আর ভিন্ন হলে ৩০-৫০% সম্ভাবনা থাকে। 

টাইপ২ ডায়াবেটিস এর লক্ষণসমূহঃ 

  • •তৃষ্ণাবোধ হওয়াঃ টাইপ২ এর একটি লক্ষণ হচ্ছে যতই পানি পান করুন না কেন আপনার তৃষ্ণাবোধ মিটবে না। এর জন্য শরীরের গ্লুকোজ ভারসাম্যহীনতা দায়ী। 
  • •ঘন ঘন প্রস্রাবঃ এই রোগের রোগীদের অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীরে জমার কারনে এমনটি হয়ে থাকে। 
  • •দুর্বলতা এবং বিভ্রান্তিঃ টাইপ ২ আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে দুর্বলতা আসে এবং অনেক সময় মস্তিষ্কেও বিরুপ প্রভাব ফেলে যার কারনে বিভ্রান্ত হতে দেখা যায়। চিন্তাভাবনা অচলাবস্থা দেখা যায়। 
  • •হাত-পায়ের অসাড়তাঃ রোগীদের হাত-পায়ে অসাড়তা আসে। নার্ভ ড্যামেজ এর কারনে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। এটি হুট করে হয়, ধীরে ধীরে এই সমস্যাটি তৈরি হয়। 
  • •চোখ জ্বালাপোড়াঃ রক্তে গ্লুকোজ কমে গেলে চোখে জ্বালাপোড়া হতে পারে। একটি নির্দিষ্ট দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে সমস্যা হয় রোগীর। 
  • •ত্বকের সমস্যাঃ এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ডার্ক স্কিন দেখা দিতে পারে। ত্বকে র‍্যাশ ধরণের কিছু দেখা যায় এবং উঁচু নিচু হয়ে থাকে ত্বক। 
  • •ওজন হ্রাসঃ স্থুলতা কিংবা বেশি চর্বি জাতীয় খাবার এর কারনে এই রোগ হলেও দেখা যায় ডায়াবেটিস হওয়ার পরে ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে থাকে। ইনসুলিনের ভারসাম্যহীনতা এর জন্যে দায়ী। 
  • •সংক্রমণঃ এই রোগের রোগীদের কোনো রোগ হলে তা ঘন ঘন সংক্রমণ হতে দেখা যায়। ঠিক হয়ে গেলেও এই রোগ আবার ফিরে আসে এমনটি দেখা যায়। যেমন নারীর ঘন ঘন ব্লাডার বা ভ্যাজাইনাআল ইনফেকশন এন্টিবায়োটিকে সেরে গেলেও তা আবার ফিরে আসতে পারে।

কীভাবে প্রতিরোধ করবো?

  • •অবশ্যই খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে। চর্বিযুক্ত খাবার কমিয়ে আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। 
  • •কর্মক্ষম হতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। নিয়মিত জগিং এবং ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রন সহ জীবন ধারণ উন্নত রাখে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে জীবনধারণ পরিবর্তন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ২৮% কমিয়ে দেয়। 
  • •চিনিযুক্ত খাবার কম এবং শাকসবজি জাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। 
  • •শস্যদানা যেমন- গম, ভুট্টা, বার্লি এসব থেকে তৈরি খাবার যেমন, ব্রেড বা পাস্তা জাতীয় খাবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে। 
  • •যাদের গ্লুকোজ সহনশীলতা কম তাদের খাদ্যাভাস পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মেটাফরমিন, একারবোস জাতীয় ওষুধ সেবন করলে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

টাইপ২ ডায়াবেটিস খুব অহরহ হচ্ছে এবং আপনারা ইতোমধ্যেই জেনেছেন জীবনধারণে অসামাঞ্জস্য থাকলে টাইপ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। আমাদের আগে থেকে সচেতন না হলে এই মহামারীর হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব হবে না। 

তথ্যসূত্রঃ 

১। https://www.bbc.com/bengali/news-43257188

২।  https://archive1.ittefaq.com.bd/print-edition/health/2016/09/03/141671.html

৩।Gardner, David G.; Shoback, Dolores, সম্পাদকগণ (২০১১)। "Chapter 17: Pancreatic hormones & diabetes mellitus"। Greenspan's basic & clinical endocrinology (9th সংস্করণ)। New York: McGraw-Hill Medical।

৪। Ripsin CM, Kang H, Urban RJ (জানুয়ারি ২০০৯)। "Management of blood glucose in type 2 diabetes mellitus"। American Family Physician। 79 (1): 29–36।


Share On Facebook

please login to review this blog and to leave a comment.


More From PlexusD

এবারের ডেঙ্গু কেনো অন্যবারের চেয়ে আলাদা?

published on: 22 Jul, 2019

এবারের ডেঙ্গু কেনো আলাদা?: এবারের ডেঙ্গু জ্বরের সাথে আগের মিল নেই। নতুন কোন শক্তিশালী ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে ছড়ানো এই অসুখ এবার ঢাকায় রীতিমতো মহামারি ...

 6373    2    0 
ডেঙ্গুঃ কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার এবং প্রতিরোধ!

published on: 21 Jul, 2019

এই বর্ষায় বৃষ্টির সাথেখিচুড়ি তাে উপভােগ করবেনই, তবে আপনারা যাতে সুস্থতার সাথেতা করতে পারেন তাইগুরুত্বপূর্ণ এক...

 1738    2    0 
ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষের যত ভুল ধারণা!

published on: 10 Jul, 2019

বাংলাদেশে ২০৩৫ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৩ মিলিয়নে! নগরায়ন ও শ...

 1703    4    1 

More From Health & Lifestyle

ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষের যত ভুল ধারণা!

author: Hasnat Zahan Shapla

বাংলাদেশে ২০৩৫ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৩ মিলিয়নে! নগরায়ন ও শ...

 1703    4    1 
কুইজঃ কতটুকু চিনি আপনার জন্যে ক্ষতিকর?

author: Farhin Ahmed Twinkle

আপনি কি খুব বেশি চিনি খাচ্ছেন? আপনার চিনি খাওয়ার অভ্যাসের ধারণা পেতে এই কুইজটির সকল প্রশ্নের উত্তর দিন — এবং আপনার এই অভ্যাস কাটাতে সহায়তা করার জন্য টিপস সম্পর্কে জ...

 1219    1    0 
হৃদরোগের ওষুধঃ কিডনির বন্ধু নাকি শত্রু?

author: Shakhawat Hossain Akash

আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে হৃদপিণ্ড এবং কিডনি অন্যতম। একদিকে হৃদপিণ্ড যখন সারা শরীরের অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত সঞ্চালনের কাজ করে , অন্যদিকে কিডনি রক্তের ফিল্টার করে ও বর্জ্যগুলো বের করে ...

 1140    2    0